মোট পৃষ্ঠাদর্শন
শুক্রবার, ২১ ফেব্রুয়ারি, ২০২৫
গঙ্গাসাগর ও কুম্ভস্নানে দেখা আমার দেশ
গত দশদিনে ভারতের যুগযুগান্ত বাহিত ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য বহনকারী দুই পুণ্যস্নানে সামিল হওয়ার সৌভাগ্য হয়েছিল আমার। ১২ই ফেব্রুয়ারি মাঘী পূর্নিমা তিথিতে আমার সত্তরোর্ধ মাকে নিয়ে পৌঁছেছিলাম প্রাচীন গঙ্গাসাগর তীর্থে আর ১৭ই ফেব্রুয়ারিতে স্নান করেছি প্রয়াগের সঙ্গম ঘাটে। বহু পুন্যার্থী এসেছিলেন স্নান করবেন বলে। আমি পশ্চিমবাংলায় গঙ্গানদীর পাশে বড়ো হয়ে ওঠা মানুষ, বাবার কাছে ছোট থেকে ভগীরথের গঙ্গাবতরনের কাহিনী যেমন শুনেছি তেমন বিজ্ঞানী জগদীশ চন্দ্রের গঙ্গানদীর সাথে বলা কথা নদী তুমি কোথা হতে আসিয়াছ? এবং সেই 'কোথা' কে খুঁজে পেতে হিমালয় যাত্রা আমাকে প্রভাবিত করেছিল। ছোট থেকে এই নদীকে মা সম্বোধন করেছি আর দেখেছি জন্ম থেকে মৃত্যু আমরা কেমন এই নদীর সাথেই জড়িয়ে আছি। এই নদীর জল, মাটি ছাড়া আমাদের সব উৎসব অসম্পূর্ণ। হিমালয় থেকে গঙ্গাসাগর এই নদীকে কেন যুগ যুগান্ত মানুষ এত শ্রদ্ধা জানায়? নদী তো সব দেশেই আছে, সব প্রাচীন সভ্যতাই নদীর তীরে গড়ে উঠেছে, তবে কি এই শ্রদ্ধা, নদীকে মাতৃজ্ঞানে উপাসনা, সুপ্রাচীন ভারতীয় সভ্যতার সজীব বহমান ধারা? গঙ্গাসাগর তীর্থ এবং প্রয়াগরাজ দুটি স্থানই প্রাচীন ভারতের জ্ঞানপীঠও বটে। দার্শনিক কপিল আজও পূজিত হন গঙ্গাসাগরে। আজ বহুযুগ পার করে দুই প্রাচীন তীর্থে স্নান করে মনে হয়েছে ভারতের সাধারণ মানুষের মাঝে আজও সেই প্রকৃতিকে শোষন নয় শ্রদ্ধার, উপাসনার ধারা আজও সাধারন ভারতীয়দের মধ্যে প্রবাহমান। তাই লক্ষ লক্ষ মানুষ ভাষা, সামাজিক, অর্থনৈতিক অবস্থান সম্পূর্ণ ভিন্ন তারা দীর্ঘ পথ অতিক্ক্রম করে অনেক কষ্ট সহ্য করে এবং শান্তভাবে সমবেত হয় নদীর সঙ্গমে এবং স্নান, উপাসনা করে শান্তভাবে ফিরে যায় নিজের ঘরে। এই যে নানা ভাষা, নানা মত পথের লক্ষ লক্ষ মানুষের বছরের পর বছর, যুগের পর যুগ নদী বিশেষত জলকে উপাসনার জন্য শান্তিপূর্ণ সমাবেশ তা প্রমান করে সুপ্রাচীন ভারতীয় সংস্কৃতির মানুষ ও প্রকৃতির শান্তিপূর্ন সহাবস্থানের, বৈচিত্র্যের মধ্যে সাংস্কৃতিক একতাকে। কুম্ভ স্নান, গঙ্গাসাগরে স্নানের ঐতিহ্য সাক্ষ্য বহন করে ভারতীয় জ্ঞান পরম্পরা ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য মানুষকে সরল,অনাড়ম্বর প্রকৃতির সাথে সহাবস্থানের জীবনযাপনে প্রেরিত করে যা আধুনিক ভোগ বিলাসবহুল প্রকৃতি ধ্বংসকারী আগ্রাসী সভ্যতার সম্পূর্ণ বিপরীত।
মঙ্গলবার, ১০ মে, ২০২২
আমার আজকের স্বদেশ ও রবীন্দ্রনাথের ঘরে বাইরে উপন্যাস
আমার আজকের স্বদেশ বড়ো অস্থির,পারস্পরিক সহাবস্থানে নানা প্রশ্নচিহ্ন। দেশপ্রেমের নানা ব্যাখ্যা নিয়ে যখন চারপাশ বিতর্কে তোলপাড় তখন রবীন্দ্রনাথের ঘরে বাইরে উপন্যাস আমাকে স্বদেশ ভাবনা সংক্রান্ত প্রায় সব প্রাসঙ্গিক উত্তর টীকাটিপ্পনী সহ ব্যাখ্যা করে আমায় সতর্ক করল। এই উপন্যাসের তিন মুখ্য চরিত্র নিখিলেশ, বিমলা, সন্দীপ যেন স্বদেশ ভাবনার তিনটি ধারা যারা আজও এই দেশে একই ভাবে সজীব ও ক্রিয়াশীল। সন্দীপের মতো নেতারা আজও মানুষকে নেতিবাচক উন্মাদনায় ক্ষেপিয়ে সমাজের সম্প্রীতির বুননকে চ্ছিন্ন বিচ্ছিন্ন করে কোনঠাসা করছে নিখিলেশের মতো গঠনমূলক,মানবদরদী, দেশহিতৈষীকে। অধিকাংশ শিক্ষিত সম্পন্ন মানুষ যেন বিমলার প্রতিনিধিত্ব করে। সন্দীপ স্বদেশপ্রেমের নামে যে বিদ্বেষ, উপদ্রবের আগুন জ্বালিয়ে তোলে সেই আগুনে ব্যক্তিগত, গোষ্ঠীগত, সামাজিক সব সম্পর্কই ছাড়খার হয় অথচ সে থাকে নিরাপদ আর সেই বিদ্বেষের আগুন নেভাতে নিজের জীবন বাজি রাখে নিখিলেশ। আজ আমার স্বদেশেরও অনেক নিখিলেশের প্রয়োজন। একমাত্র নিখিলেশের মতো মানুষদের গঠনমূলক,উদার, গনতান্ত্রিক স্বদেশ ভাবনার গভীরতায়ই আমার দেশের সাংস্কৃতিক ও ধার্মিক বৈচিত্র্যকে আশ্রয় দিতে পারে। মানুষের সাথে মানুষের লড়াই লাগার কালে নিখিলেশের, তার শিক্ষক চন্দ্রনাথ বাবুকে আজ বড়ো প্রয়োজন না হলে বিমলা, অমূল্যের মতো সরল সাধারণ মানুষ যারা সন্দীপের মতো মানুষের বানিয়ে তোলা 'আইডিয়া' এর আগুন নিয়ে খেলার অংশ হয়ে সব হারিয়ে বসেছে তারাই সেই মারন আগুন নেভাতে কার কাছে আশ্রয় চাইবে। রবীন্দ্রনাথের ঘরে বাইরে উপন্যাস গঠনমূলক ও ধ্বংসাত্মক স্বদেশ ভাবনা দুইয়ের চুলচেরা বিচার করে যা আজ শতবর্ষ পার করেও আমার দেশীয় নেতিবাচক স্বদেশ ভাবনাকে চিহ্নিত করে দেয় অতিসহজে,বলে দেয় পরিত্রাণের পথ।
লেবেলসমূহ:
ঘরে বাইরে উপন্যাস,
দেশপ্রেম,
রবীন্দ্রনাথ,
রবীন্দ্রনাথের স্বদেশ ভাবনা
রবিবার, ৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২২
লতা মঙ্গেশকরঃ এক কিংবদন্তি ভারতীয় নারী
সঙ্গীত শিল্পী লতা মঙ্গেশকর আজ প্রয়াত হয়েছেন। সমগ্র ভারতীয় উপমহাদেশ এই সুরেলা কণ্ঠকে হারিয়ে শোকাভিভূত। অন্য সব ভারতীয়ের মতো আমিও তার গান শুনেই বড়ো হয়েছি, সুর দিয়ে নিজের আবেগকে চিনতে, বুঝতে শিখেছি। কিন্তু আজ যে কথা সবচেয়ে বেশি মনে হচ্ছে তিনি রক্ষণশীল ভারতীয় সমাজে নারীর ক্ষমতায়নের প্রতীক। নয় দশকের জীবনকালে এক সাবলম্বী, দায়িত্বশীল নারীর জীবনযাপন করেছেন যিনি জীবৎকালেই সাফল্যের চূড়া ছুয়ে কিংবদন্তি। বিংশ শতাব্দীর চল্লিশের দশকে লতা মঙ্গেশকর যখন চলচ্চিত্রে সঙ্গীত শিল্পী হিসাবে কাজ শুরু করেছিলেন তখন নারী সঙ্গীত শিল্পী ও চলচ্চিত্র শিল্প দুয়ের প্রতিই ভারতীয় সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল প্রতিকূল। লতা মঙ্গেশকর তার প্রতিভা, নিষ্ঠা ও মর্যাদাপূর্ণ যাপিত জীবন দিয়ে সেই প্রতিকূলতাকে আনুকুল্যে রূপান্তরিত করেছেন। জনপ্রিয় চলচ্চিত্র সঙ্গীতের গায়িকাকে ভারতবর্ষ সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মান ভারতরত্নে সম্মানিত করেছে। লতা মঙ্গেশকরের জীবনের পথ ছিল সুকঠিন। কৈশোরে পিতৃহীন মেয়েটির যে সময় তার সংগীত প্রতিভাকে সম্বল করে লড়াই শুরু করেছিল সেইসময়কার ভারতীয় সমাজ নারীর শিল্পী হওয়ার, স্বাধীন, স্বনির্ভর হওয়ার স্বপ্নকেই অনুমোদন করত না। পুরুষ অভিভাবকদের নির্দেশ ও আদেশ অনুযায়ী পারিবারিক জীবনযাপনই ছিল একমাত্র কর্তব্য। কিন্তু দৃঢ়প্রতিজ্ঞ এই প্রতিভাময়ী শিল্পীর কাছে সমাজের রক্ষনশীলতাকে হার মানতে হয়েছিল। লতা মঙ্গেশকরের সংযমী, নিষ্ঠাপরায়ণ জীবনযাপন তার পেশাকেও তার মতো মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত করেছে। ভারতীয় মহিলা সঙ্গীত শিল্পীদের সম্মান প্রতিষ্ঠায় তার অবদান অনস্বীকার্য। তার গাওয়া প্রতিটি গান নারী জীবনের আবেগকে মূর্ত করেছে। রক্ষণশীল সমাজের নিয়মের বেড়াজালের মধ্যেও যে ভারতীয় নারীর আবেগ জীবন্ত লতা মঙ্গেশকরের গান তা প্রতিষ্ঠা করেছিল। ১৯২৯ থেকে ২০২২ জীবনের দীর্ঘ যাত্রাপথে এই মহীয়সী নারীর স্বাধীন মর্যাদাপূর্ন জীবনযাপনকে সশ্রদ্ধ প্রণাম।
বৃহস্পতিবার, ১৮ মার্চ, ২০২১
রান্নাবাটি কুটনোকাটি
রান্না শব্দটা আমাদের রোজকার জীবন যাপনের সাথে মিশে থাকা একটা মানবিক সৃজনশীলতা।
গুহাবাসী, বনবাসী মানুষ নিজের জীবনকে যখন নিজের মতো করে নিতে চেয়েছিল তার
প্রথমধাপেই ছিল রান্না। প্রকৃতির দেওয়া খাদ্যসামগ্রীকে মানুষ নিজের পছন্দের স্বাদ
গন্ধের অনুকূল করে নিয়েছিল নিজের বুদ্ধি, সৃজনশীলতা দিয়ে। চাষ আবাদ, পোশাক তৈরির
মতো মেয়েদের সাথে রান্নার যোগ বড়ো নিবিড় হয়তো সন্তানকে পালন করতে হয় বলেই। এই কয়েক
হাজার বছরে রান্না আর নারী কেমন মিশে গেছে। পুরুষেরা যদিও বীরবিক্রমে রান্না করে
তবে নারীর রান্নার সাথে কেমন ঘরকন্না মিশে আছে। আমাদের মতো সাধারণ পরিবারের মেয়েরা
তার শৈশবের খেলাঘরেই রান্নার প্রথম পাঠ নেয় আর হয়তো সেই খেলাটাকেই তার আজীবনের সাথী
করে নেয়। ভালোবাসার মানুষকে রান্না করে খাওয়ানোর যে সুখ সেটা সে উপভোগ করতে শিখে
যায়। আজ থেকে প্রায় সাড়ে তিনদশক আগে আমার খেলনার বাক্স ভরা থাকত খেলনা রান্নার
সরঞ্জামে। বাগানের লুচি পাতা, ঘাসের দানা,ইটের টুকরো আর মায়ের রান্নাঘর থেকে জোগাড়
করা হরেক ফেলা জিনিস দিয়ে তৈরি হতো খেলনা খাবার দাবার। বাবাকে, বন্ধুদের খেতেও হতো
মিছিমিছি। তবে এই মিছিমিছির রান্নাবাটিতে জানা হয়ে গিয়েছিল 'রান্না' নামক বিষয়টির
দর্শন ও আনন্দ। আধুনিক জীবনযাত্রা, প্রযুক্তি রান্নাকে আরো উপভোগ্য করেছে। আমার
পছন্দ নিরামিষ বাঙালি রান্না যেমন লাউখোসা বাটা, ফুলকপির বাটিচচ্চড়ি,বড়ির ঝাল এইসব
আরকি যা খুব সহজে সামান্য উপকরনেই বেশ সুস্বাদু হয় অনেকটা আমাদের মতো আটপৌড়ে
মেয়েদের জীবনের মতো। সেইজন্যই বড়ো কারখানায় তৈরি খাবারের চাইতে আমাদের জীবনের
কুটীরশিল্প যার আয়োজন কম প্রয়োজন বেশি সেই রান্নাবাটি কুটনোকাটির জীবন বহমান
থাক,সভ্যতা এগিয়ে চলুক।
লেবেলসমূহ:
নারী,
মেয়েদের রান্নাবান্না,
রান্না,
Women and Cooking
সোমবার, ২০ জুলাই, ২০২০
গড়পড়তা বাঙালি নারীর সামাজিক ইমেজ
আজ একবিংশ শতকে দাঁড়িয়ে গড়পড়তা বাঙালি নারীর সামাজিক ইমেজ ঠিক কেমন? এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা আর আত্মজিজ্ঞাসা একই. সমাজের নানাস্তরের মেয়েদের সাথে কথা বলে, প্রতিদিনের ঘটনাক্রম, মিডিয়ায়, টিভি সিরিয়াল, সিনেমায় মেয়েদের ভূমিকার যে উপস্থাপন দেখে মনে হয়েছে গত পঞ্চাশ বছরে আমাদের আর্থিক অগ্রগতি হলেও মেয়েরা পুরুষতন্তের বেড়াজাল কেটে মানসিকভাবে খুব বেশি মুক্ত মনের হতে পারিনি। বিবাহ নামের সামাজিক প্রতিষ্ঠান মেয়েদের সবকিছুর নিয়ন্ত্রক। সব নিজ্বসতা বিসর্জন দিয়ে পরিবারের কল্যানই যেন তার জীবনের একমাত্র উদ্দেশ্য। পুরুষতন্তের বন্ধনগুলো ধর্ম, সামাজিকতা, সম্পর্কের চিরন্তরতা - নানা অছিলায় মেয়েদের আষ্টেপৃষ্টে বেঁধে রেখেছে। যুক্তির থেকে আবেগ তাদেরকে পিছন পানে টেনে রেখেছে। এখনো এদেশের মেয়েরা মনে করে অপরের তা সে বাবা, মা, স্বামী, সন্তান - যেই হোক তার বা তাদের যুক্তিহীন আবদার রাখার দায় তার সর্বোপরি, তা যদি আত্মগ্লানিকর হয় তাও। যখন মনে হয় এই সমাজে মেয়েদের আত্মপরিচয় নির্মাণ অসম্ভব তখন হঠাৎ জানতে পারি উত্তর, উত্তর-পশ্চিম ভারতের মীরাপন্থী মেয়েদের কথা. সাধিকা মীরাবাঈকে নতুন করে চিনতে মন চায়। এক একলা মেয়ের অন্যরকম পথ চলার গল্প, সমাজের প্রচলিত প্রথাকে একপাশে সরিয়ে রেখে নতুন জীবনশৈলী চর্চার গল্প। মীরাপন্থীরা আধুনিক শিক্ষা, সুযোগ সুবিধা না পেলেও মন থেকে তারা মুক্ত, স্বাধীন। এই স্ব এর অধীন হওয়াটা খুব জরুরি. মুক্ত, উদার মনন চর্চা ছাড়া আমরা কিছুতেই পুরুষতন্তের বানিয়ে দেওয়া ইমেজের খাঁচা থেকে মুক্তি পাবো না। এখন সময় এসেছে পুরানো চাপিয়ে দেওয়া ইমেজ ভেঙে নতুন ইমেজ গড়ার যেখানে মন হবে মুক্ত, যুক্তিবাদী, উদার, অতীতের ভারমুক্ত।
লেবেলসমূহ:
নারী,
নারী স্বাধীনতা,
বাঙালি নারী,
Bengali Women,
Women's Liberation
অবস্থান:
Howrah, West Bengal, India
শুক্রবার, ১৫ মে, ২০২০
ফিরে চল মাটির টানে
সারি সারি সব হারানো মানুষ চলেছে নিজেরদের ফেলে আসা ঘরে, মাটির কাছে আশ্রয়ের আশায়। এ যেন মা বসুন্ধরার কাছে সীতার ফিরে যাওয়া। তবে এই প্রত্যাবর্তন তখনই অর্থবহ হবে যদি তা শুকিয়ে যাওয়া গ্রামীণ জীবনে নতুন প্রাণ সঞ্চার করতে পারে। পুরানো আধা সামন্ততান্ত্রিক গ্রামীণ সমাজ কাঠামোয় তা সম্ভব নয়। জাতি, ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ নির্বিশেষে সমান অধিকার আর পারস্পরিক শ্রদ্ধায় গঠিত সমাজ কাঠামোয় একমাত্র তা সম্ভব। সব হারিয়ে এই ফিরে আসা মানুষ যদি গ্রাম পুনর্গঠনের কাজে যোগ দেয় তবেই তা বাস্তবায়িত হবে। কিন্তু করা দেবে নেতৃত্ব ? কোথা থেকে আসবে গ্রাম স্বরাজের নতুন ভাবনা, কর্মীর দল যারা হাত মেলাবে প্রান্তিক মানুষজনের সাথে, দেবে নতুন জীবনের মন্ত্র? এমন স্বপ্ন দেখেছিলেন রবীন্দ্রনাথ, মহাত্মা গান্ধী, কাজ শুরু হয়েছিল গ্রাম স্তরে কিন্তু সফল হয়নি। তাঁদের এই বিফলতাই বলে দেয় সৎ প্রচেষ্টা সফল হয়, স্থায়ী হয় তখনই যখন পরিপার্শ্ব সহায়ক হয় নয়তো সেই প্রচেষ্টার মরুদ্যানকে গ্রাস করে শত শত বছরের শোষণকারীদের আক্রোশ। আমাদের ভারতবর্ষের মূল সমস্যা তথাকথিত শিক্ষিত মানুষের বৃহত্তর সমাজ থেকে, পিছিয়ে পড়া মানুষের থেকে মুখ ফিরিয়ে থাকা যা স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে আরো বেশি হয়েছে। বিগত কয়েক দশক শিক্ষিত মধ্যবিত্ত সব সামাজিক দায় থেকে মুখ ফিরিয়ে আত্মকেন্দ্রিক স্বচ্ছল, সুখী হওয়ার সাধনায় মন দিয়েছিল। তারা হয়তো ব্যক্তিগত জীবনে নিঃসঙ্গ হয়েও সফল হয়েছে কিন্তু গ্রামে, শহরে দেশ গড়ার কারিগরের অভাবে সমাজ বদলের সব স্বপ্ন ধাক্কা খেয়েছে, হারিয়ে গেছে। আজ আবার ভারত তার নবীন, শিক্ষিত মানুষের দিকে তাকিয়ে আছে যারা কৃষক, কারিগরদের যুগসঞ্চিত জ্ঞানের ভান্ডারকে স্বীকৃতি দিয়ে নিজেদের আধুনিক জ্ঞান, প্রযুক্তির সাথে সেতু বাঁধবে। গ্রাম শহরের মনের দূরত্ব ঘুচিয়ে তৈরি করবে নতুন জীবনশৈলী যার ভিত রবীন্দ্রনাথের শ্রীনিকেতনের স্বপ্নে, গান্ধীর গ্রাম স্বরাজে।তারা প্রকৃতিকে শোষণ নয় প্রকৃতির সংরক্ষণের সংস্কৃতি গড়ে তুলবে।
রবিবার, ৩ মে, ২০২০
সত্যজিৎ রায় ১০০
১০০ বছর পার অনেকখানি সময় চলে গেছে , বদলেছে প্রেক্ষাপট। বিগত শতাব্দীতে স্বাধীনতা আন্দোলন, বিশ্বযুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ, দাঙ্গা, দেশভাগ, স্বাধীনতা, গণ আন্দোলন, বিজ্ঞানের জয়যাত্রা আমাদের দেশ, সমাজকে নিয়ে গেছে নানা ঘূর্ণাবর্তের মধ্যে দিয়ে। সময়ের এই কঠিন মন্থন আমাদের থেকে অনেক কিছু কেড়ে নিয়েছিল ঠিকই তবে সৃষ্টি করেছিল কিছু অমূল্য মানব রত্ন। সত্যজিৎ রায় এমনই এক অমূল্য মানব রত্ন। আজ ২রা মে তাঁর শততম জন্মদিন, এই পণ্য সর্বস্ব, মনন চর্চার দৈন্যতার সময়কালে তাঁর রেখে যাওয়া মেধা চর্চা, সৃষ্টিশীলতার উত্তরাধিকারকে ফিরে দেখতে ইচ্ছা হয়। স্বাধীনতা পূর্ব ইংরেজ শাসনাধীন ভারতবর্ষে প্রায় দুশতাব্দী প্রগতিশীল ভারতীয়রা সমাজ, রাজনীতি, ধর্ম, শিক্ষা, সংস্কৃতিতে সংস্কারের মধ্য দিয়ে যে মুক্ত চিন্তার দেশ গড়তে চেয়েছিলেন সত্যজিৎ ছিলেন সেই সাধনার উত্তরসূরি।আজ আমরা যখন চিন্তা করতে, প্রশ্ন করতে ভুলে যাচ্ছি তখন সত্যজিৎ-এর হীরক রাজার দেশের মগজ ধোলাই যন্ত্রের কথা মনে পড়ে। রবীন্দ্রনাথের সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার বহন করে রক্তকরবীর বার্তা নূতন করে তিনি বললেন হীরক রাজার দেশে চলচ্চিত্রে। গুপী গাইন বাঘা বাইন গাইল 'নহি যন্ত্র, আমি প্রানী'। তাঁর সমস্ত সৃষ্টিতে তিনি মানব দরদী। সাহিত্যিক সত্যজিৎ আমাদের শৈশবকে অন্য রঙে রাঙিয়ে ছিলেন। আগুন্তুকের সাত্যকির মতো শিখেছিলাম কখনো কূপমন্ডুক হব না। বিশ্বজনীনতার এক অন্য ভাষা শিখেছিল আমাদের প্রজন্ম। কিন্তু আজ প্রতি মূহূর্তে মনে হয় সত্যজিৎ-এর সৃৃৃষ্টির সেই মূল্যবোধ আজকেের 'আমাকেে দেখুন' সমাজে কোথায় যেন হারিয়ে গেছে। আমরা কী সন্ধান পাব সেই হারানো মানিকের?
[আলোকচিত্রটি ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত]
বুধবার, ২২ এপ্রিল, ২০২০
বসুন্ধরা দিবস ২০২০
আজ বসুন্ধরা দিবস, বিগত ৫০ বছর মানুষ এই দিনটা পালন করছে পৃথিবীকে ভালো রাখার, ভালোবাসার অঙ্গীকার করতে। কিন্তু গত ৫০ বছরে পৃথিবীর স্বাস্থ্য ক্রমাগত খারাপ হয়েছে মানব সভ্যতার ক্রম উন্নয়নে। পৃথিবীর অনেক না- মানুষ বাসিন্দারা মানুষের অত্যাচারে ক্রমাগত কোনঠাসা হতে হতে বিলুপ্ত হয়ে গেছে আর বাকিরা কোনোরকমে টিকে আছে। মানুষ বড়ো বড়ো বাঁধ তৈরী করেছে নদী জলশূণ্য হয়ে গেছে, জলজ প্রাণ বৈচিত্র্য হারিয়ে গেছে, ভিটে মাটি জীবন জীবিকা হারিয়ে গেছে নদীর পাড়ের অসংখ্য প্রান্তিক মানুষের। দুশতকে মানুষ দুর্নিবার গতিতে এগিয়েছে - ডিনামাইট পাহাড় ভেঙেছে, খনি থেকে আকর উঠেছে, মহাকাশে স্যাটেলাইট বসেছে, যোগাযোগ দুনিয়ায় বিপ্লব হয়েছে আরো কত কী, কিন্ত তার সাথে মানুষ ও অসংখ্য জীবের বাসভূমি বসুন্ধ্ররার ক্ষতি হয়েছে অপূরনীয়। কী দিয়ে পূরণ হবে এ ক্ষতি? ভালবাসা দিয়ে, সহমর্মিতা দিয়ে। যেদিন সব মানুষ মেনে নেবে এই পৃথিবীতে তার সম অধিকার সকল জীবের, বিশ্বাস করবে এই পৃথিবী নামক নীল গ্রহটা আমাদের সকলের বাড়ি সেদিন থেকেই পৃথিবী সুস্থ হবে। গত প্রায় একমাসে, COVID-19 -এর জন্য পৃথিবী জোড়া লকডাউন প্রমান করেছে মানুষ একটু থেমে থাকলে জীবধাত্রী বসুন্ধরা কত ভালো থাকে। আমরা যদি প্রতিদিনের জীবনের ব্যস্ততা থেকে মুখ ফিরিয়ে আমাদের না-মানুষ প্রতিবেশীদের কথা একটু ভাবি, তাদের একমুঠো খাবার দিই, কী গাছটাকে বাঁচিয়ে তুলি, জীবনের প্রয়োজনটা একটু কমিয়ে নিই, অপচয় কম করি, সারারাত তীব্র আলো জ্বালার আগে একবার ভাবি পাখিদের ঘুমাতে কষ্ট হয় - এরকম ছোট ছোট কাজগুলোই হয়তো পৃথিবীর অসুখ সারবে। পৃথিবীকে ভালোবাসলেই নতুন যুগের সব গ্রেটা থুনবার্গরা ভালো থাকবে, আনন্দে থাকবে।
মঙ্গলবার, ২১ এপ্রিল, ২০২০
ভিড়তন্ত্র
ভিড় - নামহীন মানুষের জটলা জনবহুল এলাকায় যেকোনো সময় জড়ো হয় কারনে, অকারনে। যুক্তিপূর্ন আলোচনার চাইতে গুজবেই ভিড়ের অনেক বেশি আস্থা। অনেক সময়ই এই ভিড় উন্মত্ত জনতায় পরিনত হয় কোনো কারন ছাড়াই। এমন নয় যে শুধু লেখাপড়া না জানা লোকেরাই বা কম লেখাপড়া জানা মানুষেই ভিড় তৈরী করে, শিক্ষিত মানুষও সামিল হয় নির্দ্বিধায়। ভিড়ের মূল আনন্দ নিপীড়নের তা সে লোকালয়ে ঢুকে আসা বন্য জন্তুই হোক বা সন্দেহভাজন ব্যক্তি বিশেষ। সভ্যতার আদিকাল থেকেই এই ভিড়তন্ত্র খুব বলশালী। কখনো কোনো মহিলাকে ডাইনি সন্দেহে তো কখনো পথভোলা ভবঘুরেকে ছেলেধরা সন্দেহে পিঠিয়ে মারে। এই ভিড় যেকোনো নিরীহ বোকাসোকা মানুষকেও নৃশংস খুনী করে তোলে, ভিড় জানে তার অবয়বহীনতা তাকে শাস্তি থেকে রক্ষা করবে। এই ভিড় যখন ধর্মবিদ্বেষ বা জাতি বিদ্বেষের রসদ পায় তখন সে জাঁকিয়ে বসে সমাজে আর দাবি করতে থাকে ভিড়ের উৎপাত হল সমাজের স্বতঃস্ফুর্ত বহিঃপ্রকাশ। এখন সোশাল মিডিয়াকে ভিড়তন্ত্র ব্যবহার করতে শুরু করেছে তাদের নৃশংস নিপীড়নের দর্শক বৃদ্ধি করতে, আরো ভিড় তৈরীতে। নানা স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী নিজেদের উদ্দেশ্যে এই ভিড়ের উন্মত্তাকে ব্যবহার করতে শুরু করেছে। কিন্তু এখন সময় হয়েছে ভিড়তন্ত্রকে নিয়ন্ত্রন করার নয়তো এই ভিড়তন্ত্র আমাদের নিয়ন্ত্রন করবে। আমরা আইনের শাসনের পূর্ববর্তী যুগে ফিরে যাব।
শনিবার, ১৮ এপ্রিল, ২০২০
করোনার গ্রাসে আমার দেশ
সারা বিশ্বের মত আজ আমার দেশ ভারতবর্ষেও করোনা নামক রোগ দাপিয়ে বেড়াচ্ছ, চারিদিকে ভয়, অবিশ্বাস আর অনিশ্চিত ভবিষ্যতের আশঙ্কা। ভয় রোগ ছাড়া রুটি রুজিরও। দরিদ্র মানুষের ভয় আরো বেশি। ক্ষুধা, আশ্রয়হীনতা ইতিমধ্যেই থাবা বসিয়েছে তাদের জীবনে। কোটি, কোটি পরিযায়ী শ্রমিক, ছোট চাষী, ভূমিহীন কৃষি শ্রমিক, পথবাসী মানুষ, কাগজকুড়ানি - এমন অগুনতি সমাজের প্রান্তিক মানুষ সব চাইতে বেশি কষ্ট পাচ্ছে। তাদের এই অসহায়তার ছবি অনেকদিন পর জানান দিয়েছে এই সমাজে তারা বিজ্ঞাপিত না হয়ে থাকলেও, প্রায় অদৃশ্য হলেও তারাই এই সমাজের পিলসুজ। সভ্যতার আলোক তারাই বহন করে। এই বঞ্চিত মানুষগুলোই সভ্যতাকে সচল রাখে। খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, সুচিকিৎসা, সৌহার্দ্য দিয়ে জনকল্যানকামী রাষ্ট্র কতখানি পারবে ধনী দরিদ্র নির্বিশেষে নানা ধর্ম, বর্ণ, ভাষার এই বিশাল দেশকে আগলে রাখতে সেটাই দেখার।আমার শহর 'রেড+ জোনে', এখানে অটো চালক, ই-রিকশা চালক, ফুচকাওয়ালা রুজির টানে সবাই সবজি বিক্রেতা। আজ দুধ সংগ্রহে গিয়ে দেখি পাড়ার অনেক স্বচ্ছল মানুষ বস্তিতে মানুষদের সাহায্য প্রাপ্তিকেও বাঁকা চোখে দেখছে। তবে নানা সংস্থা, ধর্মীয় সংগঠন, কিছু সাধারণ মানুষ নিজেদের মতো করে সাহায্যের হাত বাড়াচ্ছে এটাই স্বস্তির। এই যুদ্ধে মানুষ ও মনুষ্যত্ব দুই জয়লাভ করুক এই প্রার্থনা।
শনিবার, ২৬ জানুয়ারি, ২০১৯
আমার দেশ – প্রজাতন্ত্র ৭০
আমি সৌভাগ্যশালী আমার
জন্ম হয়েছে স্বাধীন,
প্রজাতান্ত্রিক
ভারতবর্ষে। শৈশব, কৈশোর
অতিবাহিত হয়েছে প্রগতিশীল,
গণতান্ত্রিক
পরিবেশ। ভুবনায়নপূর্ব,
সমাজতন্ত্র
ঘেঁসা সাদামাঠা দেশীয় অর্থনীতির
আড়ম্বরহীন জীবন সহায়ক ছিল
দেশের ইতিহাস, ভূগোলে
আগ্রহী করতে। দেশপ্রেম,
আত্মত্যাগ,
আদর্শবাদ,
বিপ্লব ও বিপ্লবী
- এই
শব্দগুলো আমার কাছে দেশকে
সংজ্ঞায়িত করেছিল। রবীন্দ্রনাথ,
সুভাষচন্দ্র,
বিপ্লবী
স্বাধীনতা সংগ্রামীদের জীবনকথা
শিখিয়েছিল জাতীয়তা আন্তর্জাতিকতার
পরিপূরক, পরিপন্থী নয়। দেশ
অর্থে আমার দেশের রামধনু
সংস্কৃতি, বহুত্বকে
গ্রহন করার ঔদার্য। ধীরে ধীরে
দেশ আর্থিকভাবে সমৃদ্ধ হল,
চারপাশে চাকচিক্য
বাড়ল , জীবনে
অনেক প্রযুক্তির নিয়ন্ত্রন
বাড়ল। গতিময়, সমৃদ্ধশালী
সময়ে পরিবারের সাথে সাথে দেশের
সাথেও বাঁধন শিথিল হল। আজ
নিজেকে প্রশ্ন করি তবে কী
আমার জানা দেশের সংজ্ঞা বদলের
সময় এসেছে? উত্তর
পাই - না।
স্থির, ধৈর্যশীল
হয়ে দেশকে তার আবহমান সংস্কৃতির
মধ্যে অন্বেষনের সময় এসেছে।
দেশ চিরন্তন তাই হারানোর ভয়
নেই শুধু আত্মদীপ হয়ে দেশসেবার
প্রয়োজন। আমার দেশ - তার
জল, আকাশ,
নদী,
গাছপালা,
পশুপাখি,
সাধারন মানুষ
এখন দোহনের পরিবর্তে ভালোবাসা
চায়, সেবা
চায়, সব
দূষন থেকে মুক্তি চায়।
সোমবার, ১৪ আগস্ট, ২০১৭
স্বাধীনতা ৭১, আমার দেশঃ ফিরে দেখা
রাত
পোহালে আমার দেশের স্বাধীনতার
বয়স হবে ৭১, সেই
সাথে দেশ বিভাজনেরও ৭১। এই
৭১ -এর
প্রায় অর্ধেকের বেশি সময় আমার
দেশকে আমি খুব কাছ থেকে বিবর্তিত
হতে দেখেছি। আমার জন্ম ১৯৮০
-র
পশ্চিমবঙ্গে। তখন এই রাজ্য
জুড়ে বামপন্থী ক্ষমতায়নের
ভরা জোয়ার। আগের দশক উত্তাল
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে,
নানা রাজনৈতিক
গণআন্দোলনে। অর্থাৎ
একটা সজীব রাজনৈতিক-সামাজিক
পরিবেশ।
সাধারণ
শিক্ষিত মধ্যবিত্ত পরিবারেও
স্বদেশ চেতনার একটা ফল্গুধারা
তখনও প্রবাহিত। তখনও দেশবাসীর
কাছে স্বাধীনতা যোদ্ধা,
বিপ্লবীরা
দেশনায়ক। আমার কাছেও মহাজাতিসদনের
দেওয়ালে টাঙানো বিপ্লবী শহীদের
তৈলচিত্ররা পরিচিত আপনজন।
তারপর নয়ের দশক থেকে দেশ-কালের
ছন্দ বদলালো,
স্বাচ্ছন্দ্য
এলো আর এলো বিপননের পসরা। অনেক
ভোগ্যপন্যের আতিশয্যে,
অগাধ বিনোদনের
হাতছানিতে আর আরো ভালো থাকার
নেশায় আমার শৈশবের 'দেশ'
কোথায় হারিয়ে
গেল। আমরা বিশ্বায়িত হলাম,
তবে শৈশবে
রবীন্দ্রনাথের বিশ্বভারতীর
বিশ্বসাথে যোগের যে সংস্কৃতিকে
জেনেছিলাম তার সাথে এর কোনো
মিল ছিলনা। নিজেকে কেমন শিকড়হীন
কচুরিপানার মতো মনে হতো তবু
খুঁজে ফিরেছি আমার দেশকে আমার
মতো করে। অনুভব করেছি সেই
দেশকে ভালোবাসার সেই অবেগ
আছে, হারিয়ে
যায়নি তবে কেমন যেন চ্ছন্নছাড়া,
দিশেহারা।
ইদানীংকালে
একটা বদলের স্পন্দন অনুভব
করি নতুন প্রজন্মের মধ্যে,
আপাত পশ্চিমমুখী
জীবনযাত্রার মাঝেও তারা তাদের
সংস্কৃতির শিকড় খুঁজে চলেছে
তাদের মতো করে। গ্রন্থাগারিক
হয়ে দেখছি আজকের তরুন প্রজন্ম
মুক্ত মনে দেশকে খুঁজছে বইয়ের
পাতায়, ওয়েব
ব্রাউজারে।
শুক্রবার, ২৯ জুলাই, ২০১৬
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের ১২৫তম মৃত্যুবার্ষিকী ও তাঁর স্বপ্ন
ঈশ্বরচন্দ্র
বিদ্যাসাগরের ১২৫তম মৃত্যুবার্ষিকী ও তাঁর স্বপ্ন
আজ ঈশ্বরচন্দ্র
বিদ্যাসাগরের ১২৫তম মৃত্যুবার্ষিকী, ১২৫ বছর পরে আমার জানতে ইচ্ছা করে তিনি কী সত্যিই
বিস্মৃত অতীত নাকি তাঁর স্বপ্নেরা নিঃশব্দে পাখা মেলেছে আমাদের রোজকার জীবনে আমাদের অজান্তে ।
জীবনের অপরাহ্নে, আজীবন সংগ্রামের শেষে আপাত
ব্যর্থতার তীব্র গ্লানি তাঁকে অভিমানী করেছিল, বেদনাহত হয়েছিলেন। প্রিয় বঙ্গভূমি
ছেড়ে তিনি শেষ ১৮ বৎসরের অধিকাংশ সময় কাটিয়েছেন কর্মাটারে। কিন্তু তিনি যদি সত্যিই
ব্যর্থ হতেন তবে মাত্র দেড়শো বছরের ব্যবধানে কী আমাদের মেয়েদের জীবনে এতটা পরিবর্তন
আসত। আজ আমরা মেয়েরা যে শিক্ষার, কর্মের, স্বাধীন নাগরিকত্বের অধিকার অর্জন করেছি
সে তো তাঁরই স্বপ্নপূরণ। কল্যানকামী
রাষ্টব্যবস্থা, প্রান্তিক মানুষের খাদ্য,স্বাস্থ্য, শিক্ষার অধিকারের লড়াই তো তাঁরই
সংগ্রামের উত্তরাধিকার। জ্ঞান, ত্যাগ, সেবার মন্ত্রে দীক্ষা দিতে - ধর্ম, বর্ণ,জাতির
ঊর্দ্ধে শিক্ষাকে স্থাপন করতে ১৮৭২ খ্রীষ্টাব্দে তিনি যখন মেট্রোপলিটান কলেজ প্রতিষ্ঠা
করেন তখন তা ছিল অলীক স্বপ্ন। আজ তা বাস্তব। এখনও অনেক পথ বাকি কিন্তু যে মহান মনুষ্যত্বের
বীজ তিনি বপন করে গেছেন তা অমর – মৃত্যুহীন, সততপ্রবাহমান এক প্রাণধারা।
বুধবার, ২৩ মার্চ, ২০১৬
বসন্ত ও নাগরিক জীবন
আমি একজন নগরবাসী, আমার জীবন পরিচালিত হয় ক্যালেন্ডারের তারিখ অনুযায়ী। সেই অনুসারে আজ বসন্সত উৎসা, দোল কিন্তু আমার সাথে বসন্তের তো দেখা হয়নি। তবে সে কী আসেনি? এসেছে দেখা হয়নি। কেমন করে হবে - দখিন হাওয়া, পলাশ, কৃষঞ্চূড়া, কোকিল, চাঁদের আলো, গুনগুনিয়ে ওঠা গানের কলি... সব কেমন বিস্মৃত অতীত। প্রকৃতির সাথে সন্নগতহীন সেই বসন্ত ঊৎসবের ডালি তবে কী দিয়ে সাজানো - আবিরে, পলাশের মালায়, প্রথা অনুযায়ী পোষাকে, গানে - যা অনেক আগেই ছুটি নিয়েছে আমাদের রোজকার জীবন থেকে।
নাগরিক জীবন কী তবে বসন্তহীন? আতিশয্যের খোলস থাকলেও অন্তঃসারশূণ্য। প্রকৃতির সাথে মিলন না হলে জীবন রঙিন হবে কেমন করে? হয়তো নাগরিক আমার মন অপেক্ষা করছে কোন বসন্তের ব্রজ নির্ঘোষের।
নাগরিক জীবন কী তবে বসন্তহীন? আতিশয্যের খোলস থাকলেও অন্তঃসারশূণ্য। প্রকৃতির সাথে মিলন না হলে জীবন রঙিন হবে কেমন করে? হয়তো নাগরিক আমার মন অপেক্ষা করছে কোন বসন্তের ব্রজ নির্ঘোষের।
শুক্রবার, ১ মে, ২০১৫
বইয়ের কথা - বিশ্বকর্মার সন্ধানে
বইয়ের কথা
বিশ্বকর্মার সন্ধানে
মীরা মুখোপাধ্যায়
প্রকাশকঃ মীরা মুখোপাধ্যায়
; পরিবেশকঃ দীপায়ন। কলকাতা।
প্রথম প্রকাশঃ জানুয়ারী,
১৯৯৩
৮৯ পৃষ্ঠা
এই বইটির লেখিকা একজন
শিল্পী, শিল্পের গবেষিকা এবং ভারত ইতিহাস ও সমাজের অনালোকিত অধ্যায়ের সন্ধানকারী।
এই বইটিতে তিনি ‘বিশ্বকর্মা’ শব্দের সঙ্গে জড়িত সমস্ত মিথ, পৌরানিক, ঐতিহাসিক,
সমাজ ইতিহাসের অনালোকিত অধ্যায়গুলি আলোকিত করেছেন সংগৃহীত তথ্য, উদ্ধৃতি, ব্যক্তিগত
অভিজ্ঞতা ও বোধের আলোকে। এযেন নিজের সমাজকে নতুন করে জানা। সমাজের যে দক্ষ,
শিল্পকার, কারিগর, বাস্তুকার – কর্মাদের যে কাহিনী আমরা কখনো কান পেতে শুনতে চায়নি
বা পায়নি মীরা মুখোপাধ্যায় সেই কাহিনী এই বইতে আমাদের জানিয়েছেন। নতুন করে ভাবতে বাধ্য
করেছেন এই সুপ্রাচীন সভ্যতার প্রকৃত কারিগরদের ‘মূল’কে, টিকে থাকার সংগ্রামী
কাহিনী নিয়ে। এই বইয়ের অধ্যায়গুলির দিকে অনুসন্ধি দৃষ্টিপাত করলেই বোঝা যায় ইতিহাস
বুঝি নতুন করে কিছু বলতে চায় –
Ø
সমুদ্রমন্থন
Ø
বিশ্বকর্মাঃ কাজের সূচনা
Ø
বিশ্বকর্মা পূজার নানা সময় ও বিধিনিয়মঃ একতা ও ভিন্নতা
Ø
বিশ্বকর্মাঃ লোককথা গল্প কিংবদন্তি
Ø
ধর্মপূজা
Ø
ঘুড়ি ও বিশ্বকর্মা
Ø
বিশ্বকর্মা ও তীর্থ
Ø
অসুর এবং বিশ্বকর্মা
Ø
স্থাপত্যবিদ্যা এবং বিশ্বকর্মা
Ø
বিশ্বকর্মার সন্ধানেঃ শেষ অধ্যায়
শনিবার, ১৯ এপ্রিল, ২০১৪
বইয়ের কথা
আমি বিবেকানন্দ বলছি
মুখবন্ধ ও সম্পাদনা শংকর
প্রকাশক সাহিত্যম্
১৮ বি শ্যামাচরণ দে স্ট্রিট
কলকাতা-৭০০০৭৩
প্রথম প্রকাশ ২০০৮। পৃষ্ঠাঃ
৩৮৩।
ISBN:
81-7267-033-8। মূল্যঃ
১২৫ টাকা।
এই বইটি এক বিরল মানুষের
আত্মকথন কিন্তু আত্মজীবনী নয়। বিভিন্ন সময় বিভিন্ন প্রসঙ্গে তিনি নিজের কথা, নিজের
পরিজন, ভাবনা, স্বপ্ন নিয়ে যা বলেছেন বা লিখেছেন তার এক অসাধারণ সংকলন। পড়তে পড়তে মনে
হয় স্বামীজী যেন নিজের জীবনের গল্প বলছেন। কখনো তঁআকে মনে হয় এক ভেঙে পড়া এক হালভাঙা
মানুষ যার স্বপ্নগুলো প্রতি মূহূর্তে দলিত হচ্ছে, দেশের মানুষ্কে বুঝতে পারছেন কিন্তু
বোঝাতে পারছেন না তো আবার পরক্ষনে ঝলসা ওঠে বীর, বিপ্লবী এক তরুণ সন্ন্যাসীর সঙ্কল্প।
এই বইটি পড়ে আমি এক মানুষ বিবেকানন্দের সন্ধান পেয়েছি যার রাগ হয়, অভিমান হয় কিন্তু
মেধা, ভালবাসা আর মনুষ্যত্বের এক অফুরন্ত উৎসধারা। অ-সাধারণ এক মানুষ।
অবস্থান:
Howrah, West Bengal, India
শনিবার, ২৫ জানুয়ারি, ২০১৪
পশ্চিমবঙ্গে পঞ্চায়েতী গণধর্ষণ ও এক নারীর প্রতিক্রিয়া
পশ্চিমবঙ্গে পঞ্চায়েতী গণধর্ষণ ও এক নারীর প্রতিক্রিয়া
প্রথম ভাগ
আমি পশ্চিমবঙ্গবাসী একজন নারী এছাড়া আমার কোনো আত্মপরিচয় ছিল, আছে বা থাকবে কিনা আমি জানিনা। বিগত কয়েক মাস যাবৎ আমার চারপাশের জগৎটা ক্রমশ হিংস্র হয়ে উঠেছে টের পাচ্ছিলাম তা ব্যক্তিগত পরিসরে হোক বা কাজের জগতে। পড়াশোনার কাজে, বেড়ানোর নেশায় বাংলার বাইরে আমি বছরে দুবার তিনবা পা বাড়াই এবং সেটা প্রায় সময় একা। একা মেয়ে পথচলার অভিজ্ঞতা আমার আছে। কিন্তু ভারতবর্ষের অন্য রাজ্যের থেকে বরাবর পশ্চিমবঙ্গকে অনেকবেশি মননশীল ও কোমল বলেই বোধ হয়েছে এবং পরোক্ষ শোষণ,হেনস্থা থাকলেও সামাজিক পরিসরে একটা ভদ্রতার মোড়কে ঢাকা থাকত। কিন্তু ভারতবর্ষের মতো এরাজ্যও ক্রমশঃ নারীর প্রতি পাশবিক অত্যাচারে মত্ত হয়ে উঠেছে তা যেমন রোজকার অভিজ্ঞতায় অনুভব করেছি তেমনই সংবাদ শিরোনাম দেখে নিশ্চিত হয়েছি ভুল ভাবছি না। প্রথমে মনে হতো বিচ্ছিন্ন ঘটনা, তারপর নিত্যকার। কেন এমন হল বা হচ্ছে সে উত্তর তো খুঁজতে হবেই কিন্তু যে ঘটনা আমাকে বেদনাতে স্তব্ধ করেছে, নৃশংসতার কথা ভেবে শিহরিত করেছে তা হল আমার বাসস্থান থেকে মাত্র কিছু কিলোমিটার দুরত্বা এক ২০ বছরের আদিবাসী তরুণীকে তার গোষ্ঠীর পঞ্চায়েত জরিমানা ও গণধর্ষণের শাস্তি দিচ্ছে ভিন্ন ধর্মের যুবকে ভালোবাসার অপরাধে আর চিল শকুনের মতো ঝাঁপ দিচ্ছে তারি স্বগোষ্ঠীর আত্মীয়, প্রতিবেশীরা যাদের মধ্যে সে এতদিন বেঁচেছিল আপনজন মনে করে। তার পরিবার তার আর্তচিৎকার শুনেছে কিন্তু রক্ষা করতে পারেনি। এই পাশবিক, অমানবিক ঘটনা যেমন আমাকে বিহ্বল করেছে তার গোষ্ঠীর মহিলাদের প্রতিক্রিয়া, তাদের আচরণ। তারা এই ঘটনার সমর্থনকারী, পরোক্ষ মদতদাতা। প্রাথমিক বিহ্ববলতা কাটিয়ে ওঠার পর আমি বুঝতে চেয়েছি এরা আদৌ কোনোদিনও মনুষ্যত্বে বিশ্বাসী ছিল, মানবিক ছিল না এরা আবহঅমানকাল ধরে এমনই।
আমার মনে হয়েছে এই ধরনের ঘটনা যে এই উপমহাদেশে, এ সমাজে বিরল তা কখনোই নয়। আকছার না ঘটলেও অতীতে বহুবার যে এমন ঘটেছে সে তো মুখতারণ মাঈ এর ঘটনা তার জ্বলন্ত উদাহরণ। তখন হয়তো ভেবে সান্ত্বনা পেয়েছিলাম সীমান্তের ওপার - এপারে এমন কী করে হবে এখানে তো গ্ণতন্ত্র সুপ্রতিষ্ঠিত, এ ছিল আমার মূর্খের স্বর্গবাস। প্রযুক্তির দৌলতে যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত হওয়ায় আর কিছু না হোক অত্যাচারের খুঁটিনাটি বিবরণ ঘরে বসে অবগত হওয়া যায় আর সেই অবগতিই আমাকে সদ্য অতীত আরো কিছু ঘটনার কথা মনে করায়, কিছুদিন আগে এক যুবক প্রকাশ্য দিবালোকে তার বোনের মাথা কেটেছিল ভালোবাসার অপরাধে, পারিবারিক সম্মান রক্ষার্থে এরাজ্যেই। তাকে অনুতপ্ত হতে দেখা যায়নি। কামদুনিতে পরিচিত, প্রতিবেশী স্বজনেরাই ধর্ষণ করে খুন করেছিল তরুণীকে।প্রতিটি ঘটনাই নিজ নিজ নৃশংসতার বৈশিষ্ঠ্যে বিশিষ্ঠ কিন্তু একটি বিষয় সবঘটনাতেই লক্ষণীয় নারীর প্রতি পুরুষের, পুরুষতন্ত্রের তীব্র আক্রোশ। এই শেষ ঘটনাটিতে সেই আক্রোশ গোষ্ঠীগত সিলমোহর পেয়েছে ইযা আরো ভয়ানক। কোনো সামাজিক ব্যাধি, যদি সেই সমাজে সামাজিক শাস্তিবিধানের প্রথা হয়ে দাঁড়ায় তবে তা অকল্পনীয় এক বিপর্যয় নিয়ে আসতে বাধ্য। আজ আমার সমাজ দ্বিধাবিভক্ত নারী ও পুরুষ এই দুই শিবিরে নয় বরং নারীকে মানুষ বলে একজন জীবন্ত ব্যক্তি স্বত্তা বলে মান্যতা দেওয়া মানুষ ও পাশবিক প্রবৃত্তিকে আঁকড়ে ধরা পুরুষতন্ত্রে বিশ্বাসী কিছু মানুষ (যদিও এদের মধ্যে কোনো মানবিকতার লেশমাত্র পাওয়া যাবে না)। এ লড়াই সভ্যতার নবতম ও প্রবলতম সংকট। আমরা যারা প্রথম শিবিরের যোদ্ধা তারা এই মূহূর্তে আহত ও ভীষণভাবে আক্রান্ত কিন্তু আমরা বিশ্বাস হারায়নি, এই গভীরতম সংকটের সময় আমাদের আরো দৃঢ়প্রতিজ্ঞ, যুক্তিবাদী, মানবিক হতে হবে।শত্রু পক্ষের হিংসা বা প্রতিশোধের আগুনে ঝলসানো নয় আগুনকে আলো করে তোলার সাধনায় ব্রতী হতে হবে। আর প্রথম পদক্ষেপ ভয়হীনতা। নির্ভয়া।
আমার মনে হয়েছে এই ধরনের ঘটনা যে এই উপমহাদেশে, এ সমাজে বিরল তা কখনোই নয়। আকছার না ঘটলেও অতীতে বহুবার যে এমন ঘটেছে সে তো মুখতারণ মাঈ এর ঘটনা তার জ্বলন্ত উদাহরণ। তখন হয়তো ভেবে সান্ত্বনা পেয়েছিলাম সীমান্তের ওপার - এপারে এমন কী করে হবে এখানে তো গ্ণতন্ত্র সুপ্রতিষ্ঠিত, এ ছিল আমার মূর্খের স্বর্গবাস। প্রযুক্তির দৌলতে যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত হওয়ায় আর কিছু না হোক অত্যাচারের খুঁটিনাটি বিবরণ ঘরে বসে অবগত হওয়া যায় আর সেই অবগতিই আমাকে সদ্য অতীত আরো কিছু ঘটনার কথা মনে করায়, কিছুদিন আগে এক যুবক প্রকাশ্য দিবালোকে তার বোনের মাথা কেটেছিল ভালোবাসার অপরাধে, পারিবারিক সম্মান রক্ষার্থে এরাজ্যেই। তাকে অনুতপ্ত হতে দেখা যায়নি। কামদুনিতে পরিচিত, প্রতিবেশী স্বজনেরাই ধর্ষণ করে খুন করেছিল তরুণীকে।প্রতিটি ঘটনাই নিজ নিজ নৃশংসতার বৈশিষ্ঠ্যে বিশিষ্ঠ কিন্তু একটি বিষয় সবঘটনাতেই লক্ষণীয় নারীর প্রতি পুরুষের, পুরুষতন্ত্রের তীব্র আক্রোশ। এই শেষ ঘটনাটিতে সেই আক্রোশ গোষ্ঠীগত সিলমোহর পেয়েছে ইযা আরো ভয়ানক। কোনো সামাজিক ব্যাধি, যদি সেই সমাজে সামাজিক শাস্তিবিধানের প্রথা হয়ে দাঁড়ায় তবে তা অকল্পনীয় এক বিপর্যয় নিয়ে আসতে বাধ্য। আজ আমার সমাজ দ্বিধাবিভক্ত নারী ও পুরুষ এই দুই শিবিরে নয় বরং নারীকে মানুষ বলে একজন জীবন্ত ব্যক্তি স্বত্তা বলে মান্যতা দেওয়া মানুষ ও পাশবিক প্রবৃত্তিকে আঁকড়ে ধরা পুরুষতন্ত্রে বিশ্বাসী কিছু মানুষ (যদিও এদের মধ্যে কোনো মানবিকতার লেশমাত্র পাওয়া যাবে না)। এ লড়াই সভ্যতার নবতম ও প্রবলতম সংকট। আমরা যারা প্রথম শিবিরের যোদ্ধা তারা এই মূহূর্তে আহত ও ভীষণভাবে আক্রান্ত কিন্তু আমরা বিশ্বাস হারায়নি, এই গভীরতম সংকটের সময় আমাদের আরো দৃঢ়প্রতিজ্ঞ, যুক্তিবাদী, মানবিক হতে হবে।শত্রু পক্ষের হিংসা বা প্রতিশোধের আগুনে ঝলসানো নয় আগুনকে আলো করে তোলার সাধনায় ব্রতী হতে হবে। আর প্রথম পদক্ষেপ ভয়হীনতা। নির্ভয়া।
বুধবার, ৩ জুলাই, ২০১৩
পশ্চিমবঙ্গের লোকশিল্প ও শিল্পীসমাজ
পশ্চিমবঙ্গের
লোকশিল্প ও শিল্পীসমাজ
লেখকঃ
তারাপদ সাঁতরা
প্রকাশকঃ
লোকসংস্কৃতি আদিবাসী সংস্কৃতিকেন্দ্র
তথ্য
ও সংস্কৃতি বিভাগ, পশ্চিমবঙ্গ সরকার।
মধুসূদন
মঞ্চ, ঢাকুরিয়া। কলকাতা-৭০০০৬৮। ডিসেম্বর,২০০০।
দাম-১৩০
টাকা। ISBN: 81-87360-22-4
তারাপদ
সাঁতরার লেখা “পশ্চিমবঙ্গের লোকশিল্প ও শিল্পীসমাজ” বইটি বাংলার সামাজিক চিরায়ত
শিল্প ভাবনা ও শিল্পী গোষ্ঠী তথা সমাজজীবনে অচেতনে জড়িয়ে থাকা শিল্পীসত্ত্বা মূলতঃ
নারীদের বিগত শতাব্দী পর্যন্ত প্রচলিত আন্তঃপুরকেন্দ্রিক জীবনে বয়ে চলা শিল্প মননের
এক তথ্য সমৃদ্ধ দলিল।
আটিটি
আধ্যায়ে লেখক তার ঐতিহাসিক সত্ত্বার মেধায় ও বঙ্গভূমির লোকশিল্পের প্রতি আন্তরিক
ভালবাসায় বিভিন্ন লোকশিল্প যা আপাত দৃশ্যে অতি তুছ উপাদানে নির্মিত, রোজকার জীবনে
প্রায় আমল না দেওয়া বস্তর মধ্যে ছড়িয়ে থাকা আমাদের লোকশিল্প, তার শিল্পী ও তার
সামাজিক বিবর্তনকে বিবৃত করেছেন তার মেধাবী টিপ্পনীসহ।
আট
অধ্যায়ে বাস্তুশিল্প, লোকচিত্রকলা, চিত্র-ঊৎকীর্ণ মৃৎপাত্র, গৃহসামগ্রী, পুতুল
খেলনা, শোলার কারুকার্য, আচার অনুষ্ঠান কেন্দ্রিক মৃৎশিল্প, আঞ্চলিক লোকনৃত্যে
ব্যবহৃত মুখোশশিল্প এবং তেরোটি বিষয়ভিত্তিক পরিশিষ্ট বিষয় বৈচিত্র্যে যেমন অসাধারণ
তেমন কৌতুহলোদ্দীপক, যেমন ‘পশ্চিমবঙ্গের পটুয়া চিত্রকরঃ সামাজিক পরিবর্তন’ অথবা ‘বাঙালী
পল্লী চিত্রকরদের দাবি’ এই পরিশিষ্টের বিষ্যগুলি বাংলার সমাজে শিল্পীদের যুগযুগ
ধরে শোষিত বঞ্চিত এবং সামাজিক অবহেলা অসম্মান এবং পরিবর্তিত সময়ে পরিচয় সঙ্কট (Identity
Crisis)কে চিহ্নিত করেছে।
এই
পুস্তকে বর্ণিত অধ্যায়গুলি বাংলার সমাজজীবনের আরেক বৈশিষ্টকে তুলে ধরে - বাঙালী জাতিগতভাবে ভাবপ্রবণ, শিল্পী ও
সূক্ষ্মরসবোধের পূজারী। তাদের নান্দনিক সত্ত্বা তাই অতিতুচ্ছ উপাদান থেকেও তৈরী
করে এসেছে শিল্প সম্মত জীবনের ছাঁচ কিন্তু সেই প্রচেষ্টা আড়ম্ব্ররহীন অ-রাজকীয় আর
এই জীবনের পরতে শিল্পকে জড়িয়ে নেওয়ার মূলকান্ডারী – নারী।
গৃহশিল্প
সামগ্রী অধ্যায়ে বর্ণিত কাঁথা, কুঙ্কে, পানেরবাটা, জাঁতি, কাজললতা,চিরুনি,সি৬দুর
কৌটো, হাতপাখা, শিকা শিল্প, চারবাটি, নকশি আসন, কড়িরসাজ ও মাদুর শীতল্অপাটি, কাগজ
কাটাই নকশা, চন্দ্রপুলি ও আমসত্ত্বের ছাঁচ – আমাদের শোনায় সেইসব অন্তঃপূর
বন্দিনীদের কাহিনী যাদের মন ও কল্পনায় পাখা মেলতে চায় সৃজনের মধ্যে দিয়ে তাই তারা তাদের দৈনন্দিন ব্যবহারের
প্রতিটি বস্তুকেই সুন্দর দেখতে চায়।যদিও সমাজ পরিবর্তন, প্রযুক্তির প্রসার,
অতিব্যস্ত নগরকেন্দ্রিক জীবন থেকে এই বোধেরা আজ ছুটি নিয়েছে, রয়ে গেছে যাদুঘ্রের
প্রত্নসামগ্রী হয়ে।
এই
পুস্তক বাংলার লোকশিল্পীদের যে কাহিনী বিবৃত করেছে তা যেমন দুষ্প্রাপ্য তেমনই
লেখকের ব্যাখ্যা ততটাই প্রয়োজনীয় সেই অখ্যাত, অচেনা হারিয়ে যাওয়া শিল্পীকূলকে
চিনতে।
পরিশষ্টে
বর্নিত গ্রন্থপঞ্জি, শতাধিক চিত্র পুস্তকটিকে বাংলার অবলুপ্ত প্রায় লোকশিল্প যা
বাংলার সমাজজীবনের অন্যতম ভিত্তি তার এক অনন্য দলিলে পরিণত করেছে। বাঙালী যদি
শিকড়ের সন্ধান করে তবে এই পুস্তক একটি আলোকবর্তিকা।
বুধবার, ৬ মার্চ, ২০১৩
সোসাল নেটওয়ার্কিং, গণতন্ত্র ও গণআন্দোলন বাংলাদেশ ২০১৩
‘সোসাল নেটওয়ার্কিং’ এই শব্দবন্ধটি বিগত কয়েক বছরে
শুধুমাত্র উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারকারী ধনী, গণশিক্ষার হারে এগিয়ে থাকা দেশগুলিতেই
নয় অপেক্ষাকৃত উন্নত প্রযুক্তির সার্বিক স্পর্শ
বঞ্চিত গরীব,শিক্ষার হারে পিছিয়ে থাকা মানুষের জাতীয় জীবনকে সবার্থে নাড়া
দিতে সক্ষম হয়েছে। ইন্টারনেট ও মোবাইল প্রযুক্তি জনমত গঠন, সংগঠিত ও স্বতঃস্ফুর্ত
প্রতিবাদের এক নতুনধারার জন্ম দিতে সক্ষম হয়েছে। মতামত প্রকাশ, সমমতালম্বী
মানুষকে খুঁজে পাওয়া, সংঘবদ্ধ হওয়া এবং লক্ষ্যে পৌঁছে আবার পূর্ববর্তী ভূমিকায়
বিলীন হয়ে যাওয়ার অদ্ভুত মঞ্চ তৈরী হয়েছে। কিন্তু মজার বিষয় হল মিডিয়া ও
প্রযুক্তির কল্যাণে আমরা কেউই বোধহয় এই মঞ্চায়িত হয়ে চলা ঘটনাগুলির নীরব
দর্শক হয়ে থাকতে পারিনি। আমরা নয়তো এতে সামিল হয়েছি। সোসাল নেটওয়ার্কিং সাইটে,
ওয়েব ফোরামে ‘like’, ‘share’ করে বা ব্লগে বিতর্কে সামিল হয়ে অথবা সামিল হয়ে অথবা
অজান্তেই নিজেকে প্রস্তুত করেছি ভবিষ্যাতের লড়াইতে সামিল হতে।
আমার ব্যক্তিগত ধারনায় গনতন্ত্র এক নতুন আঙ্গিক
পেয়েছে এই নতুন ধারার সোসাল নেটওয়ার্কিং ভিত্তিক কার্যক্রমে। এই কার্যক্রম
নাগরিককে তার মতপ্রকাশ ও প্রচার এবং সেই মত সহনাগরিকদের মতামতের আলয় যাচাই করে
নেওয়ার এক অভূতপুর্ব সুযোগ দিয়েছে এবং আমরা তা গ্রহন করেছি সর্বান্তকরনে। তাই “আরব
বসন্ত”এর বাতাস রক্ষণশীল ভারতীয় সমাজের পাশে,বাধ্য করেছে তাকে “নারীর” অধিকার ও
সুরক্ষা নতুন করে ভাবতে। পুর্বে ঘটে যাওয়া সামাজিক,রাজনৈতিক গণআন্দোলন গুলির থেকে
এর চরিত্র যেমন আন্দোলন শুধু ওয়েব দুনিয়ার ভারচুয়াল মঞ্চেই থেমে যায়নি, নেমে এসেছে
রাজপথে,গলিতে – লাঠি,গুলি,বোমায় নিজেকে রক্তাক্ত করে বনিয়াদ গড়তে চেয়েছে নতুন
সমাজের। তাই যারা এই সোসাল নেটওয়ার্কিং-এ প্রত্যক্ষ সামিল হতে পারেনি বা চায়নি,
তারাও কিন্তু সংগ্রামে প্রত্যক্ষভাবে সামিল হয়েছে। মতের আদানপ্রদান গনতন্ত্রের
আঙ্গিনা অনেকখানি বিস্তৃত হয়েছে। প্রতিনিধিত্বমূলক গনতন্ত্রের নিয়মতান্ত্রিক
“তাসের দেশে” হঠাৎ যেন ‘নতুন যৌবানের দূত’ এসেছে। গ্রীক নগররাষ্ট্রের আস্বাদ যেন আমরা
পেতে শুরু করেছি নিয়মতান্ত্রিকতার বেড়াজালের মধ্যেই।
ফেব্রুয়ারি ২০১৩-এর বাংলাদেশে সোসাল নেটওয়ার্কিং ও
গনতন্ত্রের এই নতুন সম্পর্ক আরেক ধাপ এগোল আন্দোলনকারীদের “দাবি”-এর মানবিক ভিত্তির
ওপর নির্ভর করে। তারা এমন এক মুক্ত সমাজের দাবি জানিয়েছে যা যেকোনো স্বাধীনতাকামী
মানুষের চিরকালের স্বপ্ন। তাদের এমন এক গণতান্ত্রিক মুক্ত সমাজের যেখানে ব্যষ্টির
নিজ বিশ্বাস,জীবনপদ্ধতি সমষ্টির সামগ্রিক চাওয়ার কাছে মাথানত করে। এই স্বাধীন
সমাজ যা ব্যষ্টির ও সমষ্টির মধ্যে সামঞ্জস্য স্থাপন করে। এই দাবিই সোসাল
নেটওয়ার্কিংকে ভিত্তি করে গড়ে ওঠা গনতান্ত্রিক পদ্ধতিতে সংগঠিত আন্দোলনকে
গনতন্ত্রের প্রকৃত বাস্তব ভিত্তি দিতে চেয়েছে – গনতন্ত্রের জন্যই গনতান্ত্রিক
আন্দোলন, যদিও তা আহত,রক্তাক্ত ও নিহত হয়ে চলেছে প্রতিমূহুর্তে গনতন্ত্রদমনকারী
মৌলবাদের দ্বারা। তবু আশা এই বিপন্ন সময়ে এই নতুনধারার আন্দোলন হয়তো আমাদের সন্ধান
দেবে “মুক্ত”সমাজ গঠনের পথের।
লেবেলসমূহ:
গণআন্দোলন,
গণতন্ত্র,
সোসাল নেটওয়ার্কিং,
Civil Rights Movement,
Democracy,
Social Networking
বৃহস্পতিবার, ৭ জুলাই, ২০১১
আঞ্চলিক ইতিহাস
ইতিহাস চর্চার একটি বিশেষ ভাগ হল ‘আঞ্চলিক ইতিহাস’।আঞ্চলিক ইতিহাস বলতে বোঝায় কোনো একটি নির্দিষ্ট ভৌগলিক অঞ্চলের অতীত চর্চা। সেক্ষেত্রে সামগ্রিক ইতিহাস চর্চায় একটি অঞ্চলের ভৌগলিক, ঐতিহাসিক, সামাজিক, রাজনৈতিক,অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের বিবর্তনের অনেক তথ্য ও তার বিশ্লেষণই উপেক্ষিত থেকে যায় যা আঞ্চলিক ইতিহাস চর্চায় নিখুঁতভাবে লিপিবদ্ধ হয়। বিট্রিশযুক্তরাজ্য, আমেরিকা যুক্ত্ররাষ্ট্রে এই চর্চা বিশেষ প্রসার লাভ করেছে আমেরিকান লোকাল হিস্ট্রি নেটওয়ার্ক এমনই একটি ওয়েব ভিত্তিক আঞ্চলিক ইতিহাস চর্চার কেন্দ্র। বিট্রিশযুক্তরাজ্যের ন্যাশানাল আর্কাইভস আঞ্চলিক ইতিহাস নথিবদ্ধের এক অপূর্ব উদাহরণ (http://www.nationalarchives,gov.uk/records/)।ভারতীয় উপমহাদেশের একজন বাসিন্দা এবং ইতিহাস সচেতন মানুষ হিসাবে, আমার প্রত্যাশা এদেশে পথে প্রান্তরে, গ্রাম নগরে মণিমুক্তোর মতো ছড়িয়ে থাকা আঞ্চলিক ইতিহাস নথিবদ্ধকরণ ও ওয়েবভিত্তিক আর্কাইভ নির্মিত হোক যা আমাদের মতো আত্মবিস্মৃত জাতিকে তার জাতির ঐতিহাসিক বিবর্তনের ও বিপুল বৈচিত্র্যময় অতীত যা স্থানিক বৈশিষ্ট্যে বিশেষিত তা সমন্ধে সচেতন করুক। বিভিন্ন সরকারি,অসরকারি,ব্যক্তিগত সংগ্রহে তালাবন্ধ আঞ্চলিক ইতিহাস নতুন প্রযুক্তিকে আশ্রয় করে মুক্ত হোক, তা না হলে আমরা আত্মজ্ঞান লাভ করতে পারব না। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, সুন্দরবন অঞ্চল আজ আমাদের কাছে পরিচিত ম্যানগ্রোভ বণাঞ্চল হিসাবে অথচ চন্দ্রকেতুগড়, জটার দেউল,প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কৃত নানা প্রত্নসামগ্রী যদিও বলে প্রাচীন সভ্যতার বিকাশের পটভূমি হিসাবে এই অঞ্চলের অন্য এক গল্প যা শুধুমাত্র আঞ্চলিক ইতিহাস চর্চার মধ্যে দিয়েই উদ্ঘাটিত হওয়া সম্ভব।
লেবেলসমূহ:
আঞ্চলিক ইতিহাস,
Local History
এতে সদস্যতা:
পোস্টগুলি (Atom)

