মোট পৃষ্ঠাদর্শন

বুধবার, ২৩ মার্চ, ২০১৬

বসন্ত ও নাগরিক জীবন

আমি একজন নগরবাসী, আমার জীবন পরিচালিত হয় ক্যালেন্ডারের তারিখ অনুযায়ী।  সেই অনুসারে আজ বসন্সত উৎসা, দোল কিন্তু আমার সাথে বসন্তের তো দেখা হয়নি। তবে সে কী আসেনি? এসেছে দেখা হয়নি। কেমন করে হবে - দখিন হাওয়া, পলাশ, কৃষঞ্চূড়া, কোকিল, চাঁদের আলো, গুনগুনিয়ে ওঠা গানের কলি...  সব কেমন বিস্মৃত অতীত। প্রকৃতির সাথে সন্নগতহীন সেই বসন্ত ঊৎসবের ডালি তবে কী দিয়ে সাজানো -  আবিরে, পলাশের মালায়, প্রথা অনুযায়ী পোষাকে, গানে -  যা অনেক আগেই ছুটি নিয়েছে আমাদের রোজকার জীবন থেকে।

 নাগরিক জীবন কী তবে বসন্তহীন? আতিশয্যের খোলস থাকলেও অন্তঃসারশূণ্য। প্রকৃতির সাথে মিলন না হলে জীবন রঙিন হবে কেমন করে? হয়তো নাগরিক আমার মন অপেক্ষা করছে কোন বসন্তের ব্রজ নির্ঘোষের।

শুক্রবার, ১ মে, ২০১৫

বইয়ের কথা - বিশ্বকর্মার সন্ধানে



বইয়ের কথা
বিশ্বকর্মার সন্ধানে
মীরা মুখোপাধ্যায়
প্রকাশকঃ মীরা মুখোপাধ্যায় ; পরিবেশকঃ দীপায়ন। কলকাতা।
প্রথম প্রকাশঃ জানুয়ারী, ১৯৯৩
৮৯ পৃষ্ঠা
এই বইটির লেখিকা একজন শিল্পী, শিল্পের গবেষিকা এবং ভারত ইতিহাস ও সমাজের অনালোকিত অধ্যায়ের সন্ধানকারী। এই বইটিতে তিনি ‘বিশ্বকর্মা’ শব্দের সঙ্গে জড়িত সমস্ত মিথ, পৌরানিক, ঐতিহাসিক, সমাজ ইতিহাসের অনালোকিত অধ্যায়গুলি আলোকিত করেছেন সংগৃহীত তথ্য, উদ্ধৃতি, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও বোধের আলোকে। এযেন নিজের সমাজকে নতুন করে জানা। সমাজের যে দক্ষ, শিল্পকার, কারিগর, বাস্তুকার – কর্মাদের যে কাহিনী আমরা কখনো কান পেতে শুনতে চায়নি বা পায়নি মীরা মুখোপাধ্যায় সেই কাহিনী এই বইতে আমাদের জানিয়েছেন। নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছেন এই সুপ্রাচীন সভ্যতার প্রকৃত কারিগরদের ‘মূল’কে, টিকে থাকার সংগ্রামী কাহিনী নিয়ে। এই বইয়ের অধ্যায়গুলির দিকে অনুসন্ধি দৃষ্টিপাত করলেই বোঝা যায় ইতিহাস বুঝি নতুন করে কিছু বলতে চায় –
Ø  সমুদ্রমন্থন
Ø  বিশ্বকর্মাঃ কাজের সূচনা
Ø  বিশ্বকর্মা পূজার নানা সময় ও বিধিনিয়মঃ একতা ও ভিন্নতা
Ø  বিশ্বকর্মাঃ লোককথা গল্প কিংবদন্তি
Ø  ধর্মপূজা
Ø  ঘুড়ি ও বিশ্বকর্মা
Ø  বিশ্বকর্মা ও তীর্থ
Ø  অসুর এবং বিশ্বকর্মা
Ø  স্থাপত্যবিদ্যা এবং বিশ্বকর্মা
Ø  বিশ্বকর্মার সন্ধানেঃ শেষ অধ্যায়

শনিবার, ১৯ এপ্রিল, ২০১৪

বইয়ের কথা



আমি বিবেকানন্দ বলছি
মুখবন্ধ ও সম্পাদনা শংকর
প্রকাশক সাহিত্যম্‌
১৮ বি শ্যামাচরণ দে স্ট্রিট কলকাতা-৭০০০৭৩
প্রথম প্রকাশ ২০০৮। পৃষ্ঠাঃ ৩৮৩।
ISBN: 81-7267-033-8মূল্যঃ ১২৫ টাকা।
এই বইটি এক বিরল মানুষের আত্মকথন কিন্তু আত্মজীবনী নয়। বিভিন্ন সময় বিভিন্ন প্রসঙ্গে তিনি নিজের কথা, নিজের পরিজন, ভাবনা, স্বপ্ন নিয়ে যা বলেছেন বা লিখেছেন তার এক অসাধারণ সংকলন। পড়তে পড়তে মনে হয় স্বামীজী যেন নিজের জীবনের গল্প বলছেন। কখনো তঁআকে মনে হয় এক ভেঙে পড়া এক হালভাঙা মানুষ যার স্বপ্নগুলো প্রতি মূহূর্তে দলিত হচ্ছে, দেশের মানুষ্কে বুঝতে পারছেন কিন্তু বোঝাতে পারছেন না তো আবার পরক্ষনে ঝলসা ওঠে বীর, বিপ্লবী এক তরুণ সন্ন্যাসীর সঙ্কল্প। এই বইটি পড়ে আমি এক মানুষ বিবেকানন্দের সন্ধান পেয়েছি যার রাগ হয়, অভিমান হয় কিন্তু মেধা, ভালবাসা আর মনুষ্যত্বের এক অফুরন্ত উৎসধারা। অ-সাধারণ এক মানুষ।

শনিবার, ২৫ জানুয়ারি, ২০১৪

পশ্চিমবঙ্গে পঞ্চায়েতী গণধর্ষণ ও এক নারীর প্রতিক্রিয়া

পশ্চিমবঙ্গে পঞ্চায়েতী গণধর্ষণ ও এক নারীর প্রতিক্রিয়া

প্রথম ভাগ

আমি পশ্চিমবঙ্গবাসী একজন নারী এছাড়া আমার কোনো আত্মপরিচয় ছিল, আছে বা থাকবে কিনা আমি জানিনা। বিগত কয়েক মাস যাবৎ আমার চারপাশের জগৎটা ক্রমশ হিংস্র হয়ে উঠেছে টের পাচ্ছিলাম তা ব্যক্তিগত পরিসরে হোক বা কাজের জগতে। পড়াশোনার কাজে, বেড়ানোর নেশায় বাংলার বাইরে আমি বছরে দুবার তিনবা পা বাড়াই এবং সেটা প্রায় সময় একা। একা মেয়ে পথচলার অভিজ্ঞতা আমার আছে। কিন্তু ভারতবর্ষের অন্য রাজ্যের থেকে বরাবর পশ্চিমবঙ্গকে অনেকবেশি মননশীল ও কোমল বলেই বোধ হয়েছে এবং পরোক্ষ শোষণ,হেনস্থা থাকলেও সামাজিক পরিসরে একটা ভদ্রতার মোড়কে ঢাকা থাকত। কিন্তু ভারতবর্ষের মতো এরাজ্যও ক্রমশঃ নারীর প্রতি পাশবিক অত্যাচারে মত্ত হয়ে উঠেছে তা যেমন রোজকার অভিজ্ঞতায় অনুভব করেছি তেমনই সংবাদ শিরোনাম দেখে নিশ্চিত হয়েছি ভুল ভাবছি না। প্রথমে মনে হতো বিচ্ছিন্ন ঘটনা, তারপর নিত্যকার। কেন এমন হল বা হচ্ছে সে উত্তর তো খুঁজতে হবেই কিন্তু যে ঘটনা আমাকে বেদনাতে স্তব্ধ করেছে, নৃশংসতার কথা ভেবে শিহরিত করেছে তা হল আমার বাসস্থান থেকে মাত্র কিছু কিলোমিটার দুরত্বা এক ২০ বছরের আদিবাসী তরুণীকে তার গোষ্ঠীর পঞ্চায়েত জরিমানা ও গণধর্ষণের শাস্তি দিচ্ছে ভিন্ন ধর্মের যুবকে ভালোবাসার অপরাধে আর চিল শকুনের মতো ঝাঁপ দিচ্ছে তারি স্বগোষ্ঠীর আত্মীয়, প্রতিবেশীরা যাদের মধ্যে সে এতদিন বেঁচেছিল আপনজন মনে করে। তার পরিবার তার আর্তচিৎকার শুনেছে কিন্তু রক্ষা করতে পারেনি। এই পাশবিক, অমানবিক ঘটনা যেমন আমাকে বিহ্বল করেছে তার গোষ্ঠীর মহিলাদের প্রতিক্রিয়া, তাদের আচরণ। তারা এই ঘটনার সমর্থনকারী, পরোক্ষ মদতদাতা। প্রাথমিক বিহ্ববলতা কাটিয়ে ওঠার পর আমি বুঝতে চেয়েছি এরা আদৌ কোনোদিনও মনুষ্যত্বে বিশ্বাসী ছিল, মানবিক ছিল না এরা আবহঅমানকাল ধরে এমনই।
আমার মনে হয়েছে এই ধরনের ঘটনা যে এই উপমহাদেশে, এ সমাজে বিরল তা কখনোই নয়। আকছার না ঘটলেও অতীতে বহুবার যে এমন ঘটেছে সে তো  মুখতারণ মাঈ এর ঘটনা তার জ্বলন্ত উদাহরণ। তখন হয়তো ভেবে সান্ত্বনা পেয়েছিলাম সীমান্তের ওপার - এপারে এমন কী করে হবে এখানে তো গ্ণতন্ত্র সুপ্রতিষ্ঠিত, এ ছিল আমার মূর্খের স্বর্গবাস। প্রযুক্তির দৌলতে যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত হওয়ায় আর কিছু না হোক অত্যাচারের খুঁটিনাটি বিবরণ ঘরে বসে অবগত হওয়া যায় আর সেই অবগতিই আমাকে সদ্য অতীত আরো কিছু ঘটনার কথা মনে করায়, কিছুদিন আগে এক যুবক প্রকাশ্য দিবালোকে তার বোনের মাথা কেটেছিল ভালোবাসার অপরাধে, পারিবারিক সম্মান রক্ষার্থে  এরাজ্যেই। তাকে অনুতপ্ত হতে দেখা যায়নি। কামদুনিতে পরিচিত, প্রতিবেশী স্বজনেরাই ধর্ষণ করে খুন করেছিল তরুণীকে।প্রতিটি ঘটনাই নিজ নিজ নৃশংসতার বৈশিষ্ঠ্যে বিশিষ্ঠ কিন্তু একটি বিষয় সবঘটনাতেই লক্ষণীয় নারীর প্রতি পুরুষের, পুরুষতন্ত্রের তীব্র আক্রোশ। এই শেষ ঘটনাটিতে সেই আক্রোশ  গোষ্ঠীগত সিলমোহর পেয়েছে ইযা আরো ভয়ানক। কোনো সামাজিক ব্যাধি, যদি সেই সমাজে সামাজিক শাস্তিবিধানের প্রথা হয়ে দাঁড়ায় তবে তা অকল্পনীয় এক বিপর্যয় নিয়ে আসতে বাধ্য। আজ আমার সমাজ দ্বিধাবিভক্ত নারী ও পুরুষ এই দুই শিবিরে নয় বরং নারীকে মানুষ বলে একজন জীবন্ত ব্যক্তি স্বত্তা বলে মান্যতা দেওয়া মানুষ ও পাশবিক প্রবৃত্তিকে আঁকড়ে ধরা পুরুষতন্ত্রে বিশ্বাসী কিছু মানুষ (যদিও এদের মধ্যে কোনো মানবিকতার লেশমাত্র পাওয়া যাবে না)। এ লড়াই সভ্যতার নবতম ও প্রবলতম সংকট। আমরা যারা প্রথম শিবিরের যোদ্ধা তারা এই মূহূর্তে আহত ও ভীষণভাবে আক্রান্ত কিন্তু আমরা বিশ্বাস হারায়নি, এই গভীরতম সংকটের সময় আমাদের আরো দৃঢ়প্রতিজ্ঞ, যুক্তিবাদী, মানবিক হতে হবে।শত্রু পক্ষের হিংসা বা প্রতিশোধের আগুনে ঝলসানো নয় আগুনকে আলো করে তোলার সাধনায় ব্রতী হতে হবে। আর প্রথম পদক্ষেপ ভয়হীনতা। নির্ভয়া।

বুধবার, ৩ জুলাই, ২০১৩

পশ্চিমবঙ্গের লোকশিল্প ও শিল্পীসমাজ

পশ্চিমবঙ্গের লোকশিল্প ও শিল্পীসমাজ
লেখকঃ তারাপদ সাঁতরা
প্রকাশকঃ লোকসংস্কৃতি আদিবাসী সংস্কৃতিকেন্দ্র
তথ্য ও সংস্কৃতি বিভাগ, পশ্চিমবঙ্গ সরকার।
মধুসূদন মঞ্চ, ঢাকুরিয়া। কলকাতা-৭০০০৬৮। ডিসেম্বর,২০০০।
দাম-১৩০ টাকা। ISBN: 81-87360-22-4

তারাপদ সাঁতরার লেখা “পশ্চিমবঙ্গের লোকশিল্প ও শিল্পীসমাজ” বইটি বাংলার সামাজিক চিরায়ত শিল্প ভাবনা ও শিল্পী গোষ্ঠী তথা সমাজজীবনে অচেতনে জড়িয়ে থাকা শিল্পীসত্ত্বা মূলতঃ নারীদের বিগত শতাব্দী পর্যন্ত প্রচলিত আন্তঃপুরকেন্দ্রিক জীবনে বয়ে চলা শিল্প মননের এক তথ্য সমৃদ্ধ দলিল।
আটিটি আধ্যায়ে লেখক তার ঐতিহাসিক সত্ত্বার মেধায় ও বঙ্গভূমির লোকশিল্পের প্রতি আন্তরিক ভালবাসায় বিভিন্ন লোকশিল্প যা আপাত দৃশ্যে অতি তুছ উপাদানে নির্মিত, রোজকার জীবনে প্রায় আমল না দেওয়া বস্তর মধ্যে ছড়িয়ে থাকা আমাদের লোকশিল্প, তার শিল্পী ও তার সামাজিক বিবর্তনকে বিবৃত করেছেন তার মেধাবী টিপ্পনীসহ।

আট অধ্যায়ে বাস্তুশিল্প, লোকচিত্রকলা, চিত্র-ঊৎকীর্ণ মৃৎপাত্র, গৃহসামগ্রী, পুতুল খেলনা, শোলার কারুকার্য, আচার অনুষ্ঠান কেন্দ্রিক মৃৎশিল্প, আঞ্চলিক লোকনৃত্যে ব্যবহৃত মুখোশশিল্প এবং তেরোটি বিষয়ভিত্তিক পরিশিষ্ট বিষয় বৈচিত্র্যে যেমন অসাধারণ তেমন কৌতুহলোদ্দীপক, যেমন ‘পশ্চিমবঙ্গের পটুয়া চিত্রকরঃ সামাজিক পরিবর্তন’ অথবা ‘বাঙালী পল্লী চিত্রকরদের দাবি’ এই পরিশিষ্টের বিষ্যগুলি বাংলার সমাজে শিল্পীদের যুগযুগ ধরে শোষিত বঞ্চিত এবং সামাজিক অবহেলা অসম্মান এবং পরিবর্তিত সময়ে পরিচয় সঙ্কট (Identity Crisis)কে চিহ্নিত করেছে।
  
এই পুস্তকে বর্ণিত অধ্যায়গুলি বাংলার সমাজজীবনের আরেক বৈশিষ্টকে তুলে ধরে  - বাঙালী জাতিগতভাবে ভাবপ্রবণ, শিল্পী ও সূক্ষ্মরসবোধের পূজারী। তাদের নান্দনিক সত্ত্বা তাই অতিতুচ্ছ উপাদান থেকেও তৈরী করে এসেছে শিল্প সম্মত জীবনের ছাঁচ কিন্তু সেই প্রচেষ্টা আড়ম্ব্ররহীন অ-রাজকীয় আর এই জীবনের পরতে শিল্পকে জড়িয়ে নেওয়ার মূলকান্ডারী – নারী।

গৃহশিল্প সামগ্রী অধ্যায়ে বর্ণিত কাঁথা, কুঙ্কে, পানেরবাটা, জাঁতি, কাজললতা,চিরুনি,সি৬দুর কৌটো, হাতপাখা, শিকা শিল্প, চারবাটি, নকশি আসন, কড়িরসাজ ও মাদুর শীতল্অপাটি, কাগজ কাটাই নকশা, চন্দ্রপুলি ও আমসত্ত্বের ছাঁচ – আমাদের শোনায় সেইসব অন্তঃপূর বন্দিনীদের কাহিনী যাদের মন ও কল্পনায় পাখা মেলতে চায় সৃজনের মধ্যে  দিয়ে তাই তারা তাদের দৈনন্দিন ব্যবহারের প্রতিটি বস্তুকেই সুন্দর দেখতে চায়।যদিও সমাজ পরিবর্তন, প্রযুক্তির প্রসার, অতিব্যস্ত নগরকেন্দ্রিক জীবন থেকে এই বোধেরা আজ ছুটি নিয়েছে, রয়ে গেছে যাদুঘ্রের প্রত্নসামগ্রী হয়ে।

এই পুস্তক বাংলার লোকশিল্পীদের যে কাহিনী বিবৃত করেছে তা যেমন দুষ্প্রাপ্য তেমনই লেখকের ব্যাখ্যা ততটাই প্রয়োজনীয় সেই অখ্যাত, অচেনা হারিয়ে যাওয়া শিল্পীকূলকে চিনতে।

পরিশষ্টে বর্নিত গ্রন্থপঞ্জি, শতাধিক চিত্র পুস্তকটিকে বাংলার অবলুপ্ত প্রায় লোকশিল্প যা বাংলার সমাজজীবনের অন্যতম ভিত্তি তার এক অনন্য দলিলে পরিণত করেছে। বাঙালী যদি শিকড়ের সন্ধান করে তবে এই পুস্তক একটি আলোকবর্তিকা।


বুধবার, ৬ মার্চ, ২০১৩

সোসাল নেটওয়ার্কিং, গণতন্ত্র ও গণআন্দোলন বাংলাদেশ ২০১৩


‘সোসাল নেটওয়ার্কিং’ এই শব্দবন্ধটি বিগত কয়েক বছরে শুধুমাত্র উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারকারী ধনী, গণশিক্ষার হারে এগিয়ে থাকা দেশগুলিতেই নয় অপেক্ষাকৃত উন্নত প্রযুক্তির সার্বিক স্পর্শ  বঞ্চিত গরীব,শিক্ষার হারে পিছিয়ে থাকা মানুষের জাতীয় জীবনকে সবার্থে নাড়া দিতে সক্ষম হয়েছে। ইন্টারনেট ও মোবাইল প্রযুক্তি জনমত গঠন, সংগঠিত ও স্বতঃস্ফুর্ত প্রতিবাদের এক নতুনধারার জন্ম দিতে সক্ষম হয়েছে। মতামত প্রকাশ, সমমতালম্বী মানুষকে খুঁজে পাওয়া, সংঘবদ্ধ হওয়া এবং লক্ষ্যে পৌঁছে আবার পূর্ববর্তী ভূমিকায় বিলীন হয়ে যাওয়ার অদ্ভুত মঞ্চ তৈরী হয়েছে। কিন্তু মজার বিষয় হল মিডিয়া ও প্রযুক্তির কল্যাণে আমরা কেউই বোধহয় এই মঞ্চায়িত হয়ে চলা ঘটনাগুলির নীরব দর্শক হয়ে থাকতে পারিনি। আমরা নয়তো এতে সামিল হয়েছি। সোসাল নেটওয়ার্কিং সাইটে, ওয়েব ফোরামে ‘like’, ‘share’ করে বা ব্লগে বিতর্কে সামিল হয়ে অথবা সামিল হয়ে অথবা অজান্তেই নিজেকে প্রস্তুত করেছি ভবিষ্যাতের লড়াইতে সামিল হতে।
আমার ব্যক্তিগত ধারনায় গনতন্ত্র এক নতুন আঙ্গিক পেয়েছে এই নতুন ধারার সোসাল নেটওয়ার্কিং ভিত্তিক কার্যক্রমে। এই কার্যক্রম নাগরিককে তার মতপ্রকাশ ও প্রচার এবং সেই মত সহনাগরিকদের মতামতের আলয় যাচাই করে নেওয়ার এক অভূতপুর্ব সুযোগ দিয়েছে এবং আমরা তা গ্রহন করেছি সর্বান্তকরনে। তাই “আরব বসন্ত”এর বাতাস রক্ষণশীল ভারতীয় সমাজের পাশে,বাধ্য করেছে তাকে “নারীর” অধিকার ও সুরক্ষা নতুন করে ভাবতে। পুর্বে ঘটে যাওয়া সামাজিক,রাজনৈতিক গণআন্দোলন গুলির থেকে এর চরিত্র যেমন আন্দোলন শুধু ওয়েব দুনিয়ার ভারচুয়াল মঞ্চেই থেমে যায়নি, নেমে এসেছে রাজপথে,গলিতে – লাঠি,গুলি,বোমায় নিজেকে রক্তাক্ত করে বনিয়াদ গড়তে চেয়েছে নতুন সমাজের। তাই যারা এই সোসাল নেটওয়ার্কিং-এ প্রত্যক্ষ সামিল হতে পারেনি বা চায়নি, তারাও কিন্তু সংগ্রামে প্রত্যক্ষভাবে সামিল হয়েছে। মতের আদানপ্রদান গনতন্ত্রের আঙ্গিনা অনেকখানি বিস্তৃত হয়েছে। প্রতিনিধিত্বমূলক গনতন্ত্রের নিয়মতান্ত্রিক “তাসের দেশে” হঠাৎ যেন ‘নতুন যৌবানের দূত’ এসেছে। গ্রীক নগররাষ্ট্রের আস্বাদ যেন আমরা পেতে শুরু করেছি নিয়মতান্ত্রিকতার বেড়াজালের মধ্যেই।
ফেব্রুয়ারি ২০১৩-এর বাংলাদেশে সোসাল নেটওয়ার্কিং ও গনতন্ত্রের এই নতুন সম্পর্ক আরেক ধাপ এগোল আন্দোলনকারীদের “দাবি”-এর মানবিক ভিত্তির ওপর নির্ভর করে। তারা এমন এক মুক্ত সমাজের দাবি জানিয়েছে যা যেকোনো স্বাধীনতাকামী মানুষের চিরকালের স্বপ্ন। তাদের এমন এক গণতান্ত্রিক মুক্ত সমাজের যেখানে ব্যষ্টির নিজ বিশ্বাস,জীবনপদ্ধতি সমষ্টির সামগ্রিক চাওয়ার কাছে মাথানত করে। এই স্বাধীন সমাজ যা ব্যষ্টির ও সমষ্টির মধ্যে সামঞ্জস্য স্থাপন করে। এই দাবিই সোসাল নেটওয়ার্কিংকে ভিত্তি করে গড়ে ওঠা গনতান্ত্রিক পদ্ধতিতে সংগঠিত আন্দোলনকে গনতন্ত্রের প্রকৃত বাস্তব ভিত্তি দিতে চেয়েছে – গনতন্ত্রের জন্যই গনতান্ত্রিক আন্দোলন, যদিও তা আহত,রক্তাক্ত ও নিহত হয়ে চলেছে প্রতিমূহুর্তে গনতন্ত্রদমনকারী মৌলবাদের দ্বারা। তবু আশা এই বিপন্ন সময়ে এই নতুনধারার আন্দোলন হয়তো আমাদের সন্ধান দেবে “মুক্ত”সমাজ গঠনের পথের।

বৃহস্পতিবার, ৭ জুলাই, ২০১১

আঞ্চলিক ইতিহাস

ইতিহাস চর্চার একটি বিশেষ ভাগ হল ‘আঞ্চলিক ইতিহাস’।আঞ্চলিক ইতিহাস বলতে বোঝায় কোনো একটি নির্দিষ্ট ভৌগলিক অঞ্চলের অতীত চর্চা। সেক্ষেত্রে সামগ্রিক ইতিহাস চর্চায় একটি অঞ্চলের ভৌগলিক, ঐতিহাসিক, সামাজিক, রাজনৈতিক,অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের বিবর্তনের অনেক তথ্য ও তার বিশ্লেষণই উপেক্ষিত থেকে যায় যা আঞ্চলিক ইতিহাস চর্চায় নিখুঁতভাবে লিপিবদ্ধ হয়। বিট্রিশযুক্তরাজ্য, আমেরিকা যুক্ত্ররাষ্ট্রে এই চর্চা বিশেষ প্রসার লাভ করেছে আমেরিকান লোকাল হিস্ট্রি নেটওয়ার্ক এমনই একটি ওয়েব ভিত্তিক আঞ্চলিক ইতিহাস চর্চার কেন্দ্র। বিট্রিশযুক্তরাজ্যের ন্যাশানাল আর্কাইভস আঞ্চলিক ইতিহাস নথিবদ্ধের এক অপূর্ব উদাহরণ  (http://www.nationalarchives,gov.uk/records/)।ভারতীয় উপমহাদেশের একজন বাসিন্দা এবং ইতিহাস সচেতন মানুষ হিসাবে, আমার প্রত্যাশা এদেশে পথে প্রান্তরে, গ্রাম নগরে মণিমুক্তোর মতো ছড়িয়ে থাকা আঞ্চলিক ইতিহাস নথিবদ্ধকরণ ও ওয়েবভিত্তিক আর্কাইভ নির্মিত হোক যা আমাদের মতো আত্মবিস্মৃত জাতিকে তার জাতির ঐতিহাসিক বিবর্তনের ও বিপুল বৈচিত্র্যময় অতীত যা স্থানিক বৈশিষ্ট্যে বিশেষিত তা সমন্ধে সচেতন করুক। বিভিন্ন সরকারি,অসরকারি,ব্যক্তিগত সংগ্রহে তালাবন্ধ আঞ্চলিক ইতিহাস নতুন প্রযুক্তিকে আশ্রয় করে মুক্ত হোক, তা না হলে আমরা আত্মজ্ঞান লাভ করতে পারব না। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, সুন্দরবন অঞ্চল আজ আমাদের কাছে পরিচিত ম্যানগ্রোভ বণাঞ্চল হিসাবে অথচ চন্দ্রকেতুগড়, জটার দেউল,প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কৃত নানা প্রত্নসামগ্রী যদিও বলে প্রাচীন সভ্যতার বিকাশের পটভূমি হিসাবে এই অঞ্চলের অন্য এক গল্প যা শুধুমাত্র আঞ্চলিক ইতিহাস চর্চার মধ্যে দিয়েই উদ্‌ঘাটিত হওয়া সম্ভব।